Home / সংবাদ / ইউএস বাংলা উড়োজাহাজে যা ঘটেছিল

ইউএস বাংলা উড়োজাহাজে যা ঘটেছিল

বেসরকারি ইউএস-বাংলার একটি উড়োজাহাজ চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেছে। এতে উড়োজাহাজের সামনের চাকা (নোজ হুইল) না খোলার কারণে প্রবল ধোঁয়া উদগিরণ করে রানওয়েতে মুখ থুবড়ে পড়ে।

বুধবার দুপুরে নির্ধারিত সময়ের পর আরো প্রায় দেড় ঘণ্টা আকাশে উড্ডয়ন শেষে উড়োজাহাজটি রানওয়েতে নেমে আসে। উড়োজাহাজে ১৬৪ জন যাত্রী ছিলেন। আর পাইলট ও ক্রু ছিলেন সাতজন। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। নেপালের কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনার পর ফের আলোচনায় এলো ইউএস-বাংলা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও টেলিভিশনের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অবতরণের সময় উড়োজাহাজটির সামনের অংশ রানওয়েতে ঘষা লাগে। এই অবস্থাতেই বেশ কিছুদূর সামনে এগিয়ে যায় এটি। থেমে থাকা উড়োজাহাজটির ছবিতে সামনের ল্যান্ডিং গিয়ার (চাকা) দেখা যাচ্ছিল না। যাত্রীদের দ্রুত নেমে যাওয়ার জন্য ইভাকুয়েশন স্লাইড ও জরুরি দরজাও খোলা হয়। আর অগ্নিকাণ্ড এড়াতে উড়োজাহাজটিতে পানি ছিটায় ফায়ার সার্ভিস।

ইউএস-বাংলার বিমানটি সামনের চাকায় ত্রুটি দেখা দেয়ায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে সেটি দ্রুত সেখানে অবতরণ করা হয়। তবে বিমানটি অবতরণের আগেই বিমান কর্তৃপক্ষ ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্সসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করে রাখেন। শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। যাত্রীদের মধ্যে আতংক ছড়ালও তারা শেষ পর্যন্ত বিমানটি থেকে নিরাপদে বের হয়ে আসেন, জানায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সহকারী ব্যবস্থাপক হাসান জহির বলেন, ‘বিমানটি বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে যাচ্ছিল। সেখানে অবতরণের সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নোজ হুইল খুলছিল না। চালক বেশ কয়েকবার ট্রাই করেন। কিন্তু সেখানে নামতে ব্যর্থ হন। এ সময় তিনি কয়েকবার আকাশে চক্কর দেন। শেষে দেড় ঘণ্টা পর দুপুর ১টা ২০ মিনিটে উড়োজাহাজটি রানওয়েতে নেমে আসে।’

ওই বিমানের যাত্রী ছিলেন মোহাম্মদ ফারুক। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘কক্সবাজার পৌঁছার পর উড়োজাহাজটি কমপক্ষে চার থেকে পাঁচবার নামার পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু কোনোবারই নামতে পারেনি। এ সময় ভেতরের যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিমানটি চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামে।’

আরেক যাত্রী রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘দেড় ঘণ্টার মতো বিমানটি আকাশে বেশি ছিল। উড়োজাহাজে জরুরি অবতরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তখন থেকেই আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম। এ ধরনের ঘটনা ইউএস-বাংলার উড়োহাজাজে আরো ঘটেছে। এটা তাদের চরম দায়িত্বহীনতা। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা আজ বেঁচে এসেছি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক যাত্রী বলেন, আমাদের তখন ইয়া নফসি ইয়া নফসি অবস্থা। যে যার ভেস্ট পরে মাথা নিচু করে রয়েছি। এরপর উড়োজাহাজটি যখন রানওয়েতে নামলো টের পাচ্ছিলাম, ঘর্ষণে সবকিছু ভেঙ্গে যাচ্ছে। তীব্র পোড়াগন্ধ নাকে এসে লাগলো।… ফ্লাইটের ককপিট থেকে আমাদের বলা হয়নি ফ্লাইটের কোনও সমস্যা রয়েছে, তারা বলছিলেন রানওয়েতে সমস্যা বলেই কক্সবাজারে ফ্লাইটটি নামানো যাচ্ছে না, এটি চট্টগ্রামে অবতরণ করানো হচ্ছে।.

ই যাত্রী আরও জানান, প্রায় আধাঘণ্টা ধরে কক্সবাজারের আকাশে উড়োজাহাজটি যখন চক্কর খাচ্ছিল তখন যাত্রীরা এক পর্যায়ে অস্থির হয়ে ওঠেন। যাত্রীরা বিষয়টি জানতে চাইলে ককপিট থেকে জানানো হয়, রানওয়েতে সমস্যা থাকার কারণে ফ্লাইট অবতরণে দেরি হচ্ছে। এক পর্যায়ে ঘোষণা দেওয়া হয়, কক্সবাজারের রানওয়েতে সমস্যা থাকায় ফ্লাইটটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করানো হবে।

এরপর চট্টগ্রামের আকাশেও কয়েকবার চক্কর খাওয়ার পর ঘোষণা আসে সকলে যেনো লাইফভেস্ট পরে নেয় এবং মাথা নিচু করে রাখে। এতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ালেও সকলেই সে অবস্থান নিয়ে নেয়। এরপর হঠাৎ ঘর্ষণের শব্দ আসতে থাকে। বুঝা যায় উড়োজাহাজটি চাকার ওপর ল্যান্ড করতে পারেনি। ঘর্ষণে মনে হচ্ছিলো সবকিছু ভেঙ্গে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে পোড়া গন্ধও এসে নাকে লাগে। তবে এ পর্যায়ে উড়োজাহাজটির গতি থেমে গেলে দ্রুত র‌্যাফটগুলো (ইমার্জেন্সি এক্সিট) খুলে দেওয়া হলে যাত্রীরা নেমে আসে।

এদিকে উড়োজাহাজের যাত্রীদের মধ্যে ১১০ জন ট্রমায় ভুগছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪০ জন, যার মধ্যে ১৩ জনের অবস্থা কিছুটা গুরুতর। এর মধ্যে এক নারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

দুপুরে ওই দুর্ঘটনার পর সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের মেডিকেল টিম দ্রুত শাহ আমানত বিমানবন্দরে গিয়ে যাত্রীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। আক্রান্ত সব যাত্রীর প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত হওয়ার পর বিকেল ৫টার দিকে মেডিকেল টিম বিমানবন্দর ত্যাগ করেন।

সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটির যাত্রীদের মধ্যে মারাত্মক আহত কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে কমপক্ষে ১১০ জনকে পাওয়া গেছে যারা মারাত্মকভাবে সাইকোলজিক্যাল ট্রমায় আক্রান্ত। তাদের অনেককে বিমর্ষ দেখা গেছে।

প্রাথমিকভাবে তাদের ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, ‘এসব যাত্রীর অনেকেই ঘুমের মধ্যে ফ্লাইটে আগুন ধরে যাওয়া কিংবা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠার মতো সমস্যায় ভুগতে পারেন। তাদের ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে উঠলে তাদের মনরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’

সিভিল সার্জন আরও জানান, উড়োজাহাজ অবতরণের পর হুড়োহুড়ি করে নামার সময় পড়ে গিয়ে এবং পাখার আঘাতে ৪০ জন যাত্রীর কেউ হাতে, কেউ পায়ে আঘাত পেয়েছেন। কারও মাথা কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশে কেটে গেছে। এদের মধ্যে ২৭ জনকে সামান্য ড্রেসিং করে দিতে হয়েছে, ১২ জনকে ব্যান্ডেজ দিতে হয়েছে।

এক নারীকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে জানিয়ে ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘ওই নারীর আগে থেকেই পায়ে সমস্যা ছিল। পা ফোলা ছিল। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আরও সমস্যা হয়েছে। তাকে বিমানবাহিনীর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আশঙ্কার কোনো কারণ নেই।’

অন্যদিকে জরুরি অবতরণের ঘটনায় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এ ঘটনা তদন্ত করতে অভ্যন্তরীণভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও। এছাড়া উড়োজাহাজটির নির্মাতা বোয়িংয়ের লোকাল এজেন্টও কাজ শুরু করেছে।

গত ১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ। ওই দুর্ঘটনায় ২৭ বাংলাদেশিসহ ৫২ জন নিহত হয়েছেন। উড়োজাহাজে ৭১ আরোহী ছিলেন।

উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা জানতে নেপাল ও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের দাবি, কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ভুল নির্দেশনা দেওয়ার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে এ দাবি অস্বীকার করেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।