Home / লাইফ স্টাইল / পান্তা ভাতের উপকারিতা! ‘পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল’

পান্তা ভাতের উপকারিতা! ‘পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল’

পান্তা ভাতের উপকারিতা- রাতে রান্না করা ভাত যেন নষ্ট না হয় এবং পরের দিনও যাতে খাওয়া যায় তার জন্য গ্রাম এলাকায় ভাতে পানি দিয়ে সারা রাত ভিজিয়ে রাখার পর সকালে তৈরি হয়ে যায় পান্তা ভাত। ভাত সংরক্ষণের এই পদ্ধতি পান্তা ভাত নামে পরিচিত।

পহেলা বৈশাখে পান্তা খাওয়ার উৎসব শুরু হয়ে যায়। শহরের মানুষেরা এই পান্তা ভাত খায় ঐতিহ্য হিসাবে কিন্তু আমরা হয়তো অনেকেই জানি না এই অতি পরিচিত পান্তা ভাতের উপকরিতা। যদি জানতাম তাহলে হয়তো প্রত্যেকদিনই খেতাম।

কথায় আছে, পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল। হ্যা সত্যি তাই পান্তা শরীরের জন্য খুবই উপকারী। কারণ বলিষ্ঠ শরীর এবং নিজেকে সুষ্ঠু রাখতে পান্তা ম্যাজিকের মত কাজ করে থাকে। ১২ ঘণ্টা ভাত ভিজিয়ে রাখলে ১০০ গ্রাম পান্তায় ৭৩.৯১ মিলিগ্রাম আয়রন তৈরি হয়। আর সেই সম পরিমাণ গরম ভাতে আয়রন থাকে মাত্র ৩.৪ মিলিগ্রাম।

এছাড়া আমেরিকার নিউট্রিশিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা জানাচ্ছে ভাত পানিতে ভিজিয়ে রাখলে পাকস্থলীর প্যানক্রিয়াটিক অ্যামাইজেল সহ আরও কিছু এনজাইমের কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

দেহের বহু উপকারী ব্যাকটেরিয়া পান্তা ভাতে তৈরি হয়।

পান্তা ভাতের ক্যালরি মূল্য নির্ভর করে কি ধরনের চাল দিয়ে রান্না করা হয়েছে তার উপর। চাল ভেদে ১ কাপ ভাত থেকে ২০০- ২৪২ ক্যালরি পাওয়া যায়। অনেকে পান্তা ভাতের সাথে ঘি খেয়ে থাকেন। ১ টেবিল চামচ ঘি থেকে পাওয়া যায় ১১২ ক্যালরি। দই পান্তা ও জিরা পান্তার ক্যালরি মূল্য আরও বেশি। কারণ এগুলো তৈরিতে ব্যবহৃত হয় টক দই ও তেল।

পান্তা ভাতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়ামের পরিমাণ রান্না করা ভাতের তুলনায় বেশি থাকে। অন্যদিকে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে যায়। যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এছাড়া ভিটামিন -বি ২ , ভিটামিন -বি ১২ অপেক্ষাকৃত বেশি থাকে।

পান্তা ভাত দেহে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করে দেহকে পানিশূন্যটা থেকে রক্ষা করে। তীব্র গরমে সান-স্ট্রোক বা হিট-স্ট্রোক থেকে রক্ষা করে। পান্তা গ্যাস্টিক রোগীর জন্যও উপকারী।

তবে ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া বয়স্কদের জন্যও পান্তা মোটেই ভালো নয়।

গরম ভাতের চেয়ে পান্তায় পুষ্টি বেশি। গরম ভাতের তুলনায় পান্তা সহজে হজম হয়। গরম ভাতের চেয়ে পান্তায় সোডিয়াম কম থাকায় রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে, তবে এর সাথে লবণ বেশি নেওয়া যাবে না।

ভাতে পানি দিয়ে রাখলে বিভিন্ন গাজনকারি ব্যাক্টেরিয়া বা ইস্ট শর্করা ভেঙে ইথানল ও ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে। গাজনকারি ব্যাক্টেরিয়া যে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে এর ফলে পান্তা ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায়। তখন পচনকারী ও অন্যান্য ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়া, ছত্রাক ভাত নষ্ট করতে পারে না।

আসুন জেনে নিই পান্তা ভাতে কী কী উপকারিতা রয়েছেঃ-

♦ আমরা যে সাধারন চাল সিদ্ধ করে ভাত রান্না করি তার মধ্যে ফাইটিক এসিড থাকে যা বিভিন্ন খনিজ লবন যেমন-লৌহ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং যা এইসমস্ত খনিজ লবণকে দেহে শোষনে বাধা দেয়।

কিন্তু যখন ভাতকে সারা রাত ভিজিয়ে রাখা হয় তখন ভাতের শর্করা গাঁজনের ফলে ল্যাকটিক এসিড তৈরি হয় যা ভাতের সকল খনিজ লবণকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়।

♦ ১০০ গ্রাম ভাতকে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে পান্তাভাত তৈরি করলে তাতে লৌহ বা আয়রনের পরিমাণ ৩.৪ মিলিগ্রাম থেকে ৭৩.৯১ মিলিগ্রাম হয়। যাদের রক্তস্বল্পতা আছে তাদের জন্য পান্তাভাত খুবই উপকারি।

♦ ১০০ গ্রাম ভাতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ২১ মিলিগ্রাম থাকে যা পান্তা ভাতে ৮৫০ মিলিগ্রাম হয়ে যায়। যাদের হাড় ক্ষয় রোগ বা দেহে ক্যলসিয়ামের অভাব আছে তারা খেতে পারেন পান্তা।

♦ পান্তা ভাতে পটাসিয়াম বেড়ে ৮৩৯ মিলিগ্রাম হয়। ফলে যাদের হৃদরোগ আছে বা যাদের উচ্চ রক্ত চাপ আছে তাদের জন্য পান্তা উপকারী।

♦ পান্তা ভাতে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে ৪৭৫ মিলিগ্রাম থেকে ৩০৩ মিলিগ্রাম হয়। জিংকের পরিমাণও বেড়ে যায় অনেক গুণ। যেকোন মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ভাল।

♦ সকালের নাস্তার জন্য খুবই ভাল খাবার পান্তা। কারণ পান্তা ভাত শরীরের অম্ল ও ক্ষারের সমতা রক্ষা করে। শরীরকে ঠান্ডা রাখে। এক কাপ চা বা কফির চেয়ে শরীরের জন্য অনেক ভাল একপ্লেট পান্তা ভাত।

♦ পান্তা ভাত ভিটামিন বি৬ এবং বি১২ এর ভাল উৎস যা রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে এবং অন্য কোন খাবারে এত সহজে এত পরিমাণে এই ভিটামিন পাওয়া যায় না।

♦ পান্তা ভাতে প্রচুর উপকারি ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় যা হজমে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে শক্তি যোগায়।

♦ পান্তাভাত কোলাজেন তৈরি করে যা ত্বকের ইলাস্টিসিটি রক্ষা করে এবং নতুন কোষ তৈরি করে।

♦ পান্তা ভাত আলসার নিরাময়ে সাহায্য করে।

♦ পান্তা ভাত পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।

♦ পান্তাভাত যদি লাল চালে ভাতের হয় তাহলে তার পুষ্টিগুণ আার বেশি হয় সাদা চালের পান্তা থেকে আবার বসা ভাত অর্থাৎ মাড় না ফেলে যে ভাত রান্না করা হয় সেই পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ মাড় ফেলা ভাতের পান্তা থেকে বেশি হয়।