Home / লাইফ স্টাইল / পায়ের পাতা ও গোড়ালির ব্যথার কারণ, প্রতিকার

পায়ের পাতা ও গোড়ালির ব্যথার কারণ, প্রতিকার

গোড়ালির ব্যথাকে ইংরেজিতে ‘হিল পেইন’ বলে। গোড়ালির ব্যথা সাধারণত গোড়ালির নিচের দিকে অথবা গোড়ালির পেছন দিকে হয়। যদি আপনার গোড়ালির ব্যথা নিচের দিকে হয় তাহলে বুঝতে হবে এটার কারণ হলো প্লান্টার ফাসাইটিস। এ ক্ষেত্রে হাঁটলে পায়ের গোড়ালিতে ব্যথা বাড়ে, সকালবেলা ব্যথা বেশি থাকে এবং বেলা বাড়ার সাথে সাথে ব্যথা কিছুটা কমে; কখনো কখনো গোড়ালি শক্ত বলে মনে হয় এবং শক্ত জুতা ব্যবহার করলে ব্যথা বেড়ে যায়। গোড়ালি কখনো কখনো ফুলে যায়।

আর পায়ের গোড়ালির পেছনের দিকে ব্যথা হয় সাধারণত অ্যাকিলিস টেনডিনাইটিস হলে। এই ব্যথা গোড়ালির হাড়ের সাথে যেখানে অ্যাকিলিস টেনডন মিশেছে সেখানে হয়। গোড়ালির ব্যথা বেশ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে এবং অনেকে এই ব্যথায় চলাফেরা করতে পারেন না।

গোড়ালিতে ব্যথা কেন হয়: ক্যালকেনিয়াম বা গোড়ালির হাড়ে এবং পায়ের তলার মাংসপেশিতে সমস্যা হলে সামান্য থেকে মারাত্মক ধরণের ব্যথা হয়। যেহেতু শরীরের সব চাপ পড়ে গোড়ালি ও পায়ের পাতার ওপর, তাই গোড়ালিতে ব্যথা হলে গোড়ালিতে ভর দিয়ে হাঁটাচলা করতে কিংবা কোনো কাজকর্ম করতে রোগী অসমর্থ হন। বিভিন্ন কারণে গোড়ালিতে ব্যথা হতে পারে। তবে সাধারণ কারণগুলো হলো-

অ্যাকিলিস টেনডিনাইটিস। এ ক্ষেত্রে অ্যাকিলিস টেনডনে প্রদাহ জনিত কারণে ব্যথা হয়। ব্যথা বেশ তীব্র হয়।
অ্যাকিলিস টেনডন রাপচার। এ ক্ষেত্রে অ্যাকিলিস টেনডেন ছিঁড়ে যায়।

আঘাতজনিত কারণ। এ ক্ষেত্রে গোড়ালিতে আঘাত লাগলে ব্যথা অনুভূত হয়। হাড় ভাঙলে অথবা চাপ পড়লে ব্যথার সৃষ্টি হয়।
হাড়ের টিউমার, বার্সাইটিস, ফাইব্রোমায়ালজিয়া, গোড়ালির হাড় ভাঙা, গাউট ইত্যাদি এবং গোড়ালির প্যাড ছিঁড়ে যাওয়া।
হিল স্পার। দীর্ঘ দিন প্লান্টার ফাসাইটিস থাকলে ফাসা টিস্যু ব্যান্ড যেখানে আপনার হিল বোনের বা গোড়ালির হাড়ের সাথে সংযুক্ত হয়, সেখানে হিলস্পার (ক্যালসিয়াম জমা হওয়া) গঠন হতে পারে। আপনার হাড়ের উদ্ভেদ দেখার জন্য এক্স-রে করা যেতে পারে। উদ্ভেদ বা প্রকটন বিভিন্ন মাপের হতে পারে।
অস্টিওমাইলাইটিস। এটি হাড়ের সংক্রমণ এবং প্রান্তিক স্নায়ুর সমস্যা।

প্লান্টার ফাসাইটিস। এটি গোড়ালির বিশেষ ধরণের বাত। বেশি দৌঁড়ালে বা লাফঝাঁপ দিলে টিস্যু ব্যান্ড বা ফাসার (এটি গোড়ালির হাড় থেকে পায়ের আঙুলের গোড়া পর্যন্ত বিস্তৃত) প্রদাহ হতে পারে।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, স্ট্রেস ফ্রাকচার এবং টারসাল টানেল সিনড্রোম।
কখন ডাক্তার দেখাবেন: যদি আপনার নিচের উপসর্গগুলো থাকে তাহলে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন-

আপনার গোড়ালির আশপাশে তীব্র ব্যথা হলে ও ফুলে গেলে।
যদি আপনি আপনার পায়ের পাতা বাঁকা করে নিচের দিকে নামাতে না পারেন, পায়ের আঙুল ওঠাতে না পারেন কিংবা ভালোভাবে হাঁটতে না পারেন।
যদি আপনার গোড়ালির ব্যথার সাথে জ্বর থাকে, গোড়ালি অবশ হয়ে যায় কিংবা ঝিনঝিন করে।
আঘাতের সাথে সাথে যদি গোড়ালিতে তীব্র ব্যথা হয়।
গোড়ালির ব্যথা খারাপ কিনা বুঝা যাবে কিভাবে:

আপনি না হাঁটলেও কিংবা দাঁড়িয়ে না থাকা সত্ত্বেও যদি আপনার গোড়ালিতে অবিরাম ব্যথা থাকে।
আপনি বিশ্রাম নেয়া, বরফ দেয়া ও অন্যান্য ঘরোয়া চিকিত্সা নেয়ার পরও যদি আপনার গোড়ালির ব্যথা কয়েক সপ্তাহ ধরে স্থায়ী থাকে।
চিকিৎসা:

পূর্ণ বিশ্রামে থাকবেন এবং কিছু ব্যায়াম করবেন। ব্যথানাশক শুধু খাবেন। পেছনে খোলা- এমন জুতা পরবেন।
নিচু হিলের জুতা পরবেন এবং প্রদাহ কমাতে আপনার গোড়ালির পেছনে বরফ দেবেন। [১] প্ল্যানটার ফেসাইটিস: যদি পায়ের গোড়ালির ব্যাথার কারণে আপনাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় বা সকালে বিছানা থেকে কয়েক কদম পা ফেলতে গিয়েই যদি পায়ের তলায় ব্যাথা অনুভব করেন তাহলে বুঝতে হবে যে আপনার প্ল্যানটার ফেসাইটিস হয়েছে।

আমাদের পায়ের তলায় যে কানেক্টিভ টিস্যু থাকে তাকে প্ল্যানটার ফেসিয়া বলে। এই প্ল্যানটার ফেসিয়া নামক সংযোগকারী কলার ইনফ্লামেশন বা প্রদাহের জন্যই প্ল্যানটার ফেসাইটিস বা পায়ের গোড়ালির ব্যাথা হয়। এটা মারাত্মক কোন সমস্যা না। তবে এটা অনেক বেশি পীড়া দায়ক একটি সমস্যা। কিন্তু সুখবর হচ্ছে- এই সমস্যা প্রতিরোধের সহজ কিছু উপায় আছে।আসুন আমরা জেনে নেই যন্ত্রণাদায়ক সমস্যাটির আরো কিছু কারণ ও এর প্রতিকার সম্পর্কে।

কেনো হয় প্ল্যানটার ফেসাইটিস? হাফিংটন পোষ্টকে ডাইনামিক ফিজিক্যাল হেলথ এর কাইরো প্র্যাকটিস ফিজিসিয়ান ডাক্তার এরিক করজেন বলেন, “বিভিন্ন কারণে প্ল্যানটার ফেসাইটিস হতে পারে।“ করজেন যে কারণ গুলো বলেন তা হল-

পায়ের পাতার মাংসপেশির দুর্বলতা

গোড়ালির পেশী শক্ত হলে

গোড়ালিতে অনেক বেশি চাপ পড়লে

ত্রুটিপূর্ণ জুতা পরার কারণে

কম নড়াচড়া করার জন্য এবং

হাটু বা কোমরের কোন সমস্যার কারণে প্ল্যানটার ফেসাইটিস হতে পারে
ওজন বেশি হলেও প্ল্যানটার ফেসাইটিস হতে পারে।
উপসর্গ:

সকালে বিছানা থেকে নেমে হাঁটতে গেলে গোড়ালিতে ছুরি দিয়ে খোঁচানোর মত তীক্ষ্ণ একধরণের ব্যাথা হয় যা কিছুক্ষণ পর ভালো হয়ে যায়।
পায়ের পাতা বা গোড়ালির মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়।

হঠাৎ ব্যায়াম করলে ব্যাথা হতে পারে।

দৌড়ালে বা লাফালাফি করলে ব্যাথা হতে পারে।
অনেকক্ষণ দাড়িয়ে কাজ করলে বা অনেকক্ষণ বসে থাকার পর উঠতে গেলে গোড়ালিতে ব্যাথা হয়।
প্রতিকার:

বরফ ম্যাসাজ: যেহেতু প্ল্যানটার ফেসাইটিস টিস্যুর প্রদাহের জন্য হয় সেহেতু বরফ এই প্রদাহকে দূর করতে পারে। ফ্রিজের একটি ঠাণ্ডা বোতল পায়ের নিচে রেখে সামনে পেছনে ঘোড়ান, এভাবে ১০ মিনিট করুন। দিনে ২ বার এটা করতে পারেন, ব্যাথা কমে যাবে।

টেনিস বল ম্যাসাজ: পায়ের নীচে ১টি টেনিস বল রেখে সামনে পেছোনে কয়েক মিনিট ঘোরান। এটাতে কিছুটা ব্যাথা লাগতে পারে।আস্তে আস্তে পা দিয়ে বলের উপর চাপ বাড়াতে থাকুন। এভাবে দুই পায়ে কয়েকবার করে করুন।

কাফ স্ট্রেচিং: দেয়ালে দিকে মুখ রেখে দাঁড়ান। দুই হাত দেয়ালে চেপে রাখুন, যে পায়ে ব্যাথা হচ্ছে সেই পা টি বাঁকা করে ফ্লোর এর উপর চাপ দিন ও অন্য পা টি সোজা রাখুন। দৌড়ানোর মত ভংগি হবে। এভাবে ৩০সেকেন্ড থাকুন। তারপর অন্য পায়ে ও একই ভাবে করুণ। প্রতি পায়ে ৩ বার করে করুন।
বিছানায় গোড়ালির স্ট্রেচিং: সকালে পায়ের পেশী শক্ত হয়ে থাকে। তাই বিছানা থেকে নামার আগেই পেশীকে শিথিল করার জন্য স্ট্রেচিং করে নিন। এর জন্য একটি তোয়ালে বা বেল্ট দিয়ে পায়ের পাতায় জড়িয়ে নিজের দিকে টান দিন। এতে গোড়ালিতে টান পড়বে। ৩০ সেকেন্ড এভাবে টেনে ধরে রাখুন.৫বার করে প্রতি পায়ে করুন। তারপর বিছানা থেকে পা ফেলুন। হাই হিল না পড়ে স্লিপার জুতা পড়ুন ও ওজন কমানোর চেষ্টা করুন। এই পদ্ধতি গুলো অনুসরণ করার পর ও যদি গোড়ালির ব্যাথা থাকে তাহলে ডাক্তার দেখান।

গোড়ালি ব্যথার প্রাকৃতিক সমাধান: পায়ের গোড়ালির হাড়ের নিচের অংশে ক্যালসিয়াম জমে কিছুটা বাড়তি অংশ তৈরি হয়। জীবনের কোনো একসময় অনেকেই এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তবে কোনো উপসর্গ না থাকায় বুঝতে পারেন না। যখন ক্যালসিয়াম জমে যাওয়া অংশের চারপাশের কোষকলায় প্রদাহ হলে তখনই ব্যথা হয়।

এই সমস্যা হওয়ার বিভিন্ন কারণ আছে। যেমন শক্ত মেঝেতে অতিরিক্ত লাফালাফি এবং দৌড়ানো। ভুল মাপের বা পুরনো জুতা পরা, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স এবং ডায়াবেটিস থেকেই এই রোগ হতে পারে। সাধারণত গোড়ালির হাড় বেড়ে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। হাঁটা বা দৌড়ানোর সময় উপসর্গটি ধরা পড়ে। ভুক্তভোগীদের মতে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ব্যথা তীক্ষ্ণ হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে ব্যথা কমে আসে।

এই সমস্যার একটি সমাধান হল অপারেশনের মাধ্যমে গোড়ালির হাড়ে জমে যাওয়া বাড়তি ক্যালসিয়াম অপসারণ করা। তবে শতকরা ৯০ ভাগ ভুক্তভোগী অপারেশন ছাড়াই সমস্যাটি থেকে মুক্তি পেয়ে থাকেন। এসব চিকিৎসার মধ্যে আছে থেরাপি, বিশেষধরনের জুতা ব্যবহার বা জুতায় ‘অর্থোটিক’ ডিভাইস ব্যবহার, পেইনকিলার ইত্যাদি। এছাড়াও আছে কিছু প্রাকৃতিক উপায়। এসম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছে স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইট।

বরফ: শারীরিক পরিশ্রম করার ১৫ মিনিট আগে গোড়ালির যে স্থানে ব্যথা হয় সেখানে বরফ ধরে রাখতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী বার বার বরফ ব্যবহার করা যাবে। বরফ ব্যবহার ক্যালসিয়াম জমে যাওয়া অংশটির চারপাশের কোষকলায় প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
অ্যাপল সাইডার ভিনিগার: এই টকজাতীয় তরল মাখানোর মাধ্যমে গোড়ালিতে জমে থাকা ক্যালসিয়ামের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া বলে মনে করা হয়। অ্যাপল সাইডার ভিনিগারে এক টুকরা ব্যান্ডেজের কাপড় ডুবিয়ে আক্রান্ত গোড়ালির উপর বসিয়ে বেঁধে রাখা যেতে পারে। এই পদ্ধতি ব্যবহারের সময় বিশ্রামে থাকলে ভালো উপকার মিলবে।

বাঁধাকপির পাতা: প্রদাহরোধকারী উপাদানযুক্ত বলে পরিচিত বাঁধাকপির পাতা আক্রান্ত গোড়ালিতে বেঁধে রেখেও ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। ব্যবহারের আগে পাতাটিকে সামান্য গরম করে নরম করে নিয়ে লাগাতে হবে। শুকিয়ে গেলে তা পরিবর্তন করে নতুন পাতা লাগাতে হবে।
বেইকিং সোডা: বেইকিং সোডায় কয়েক ফোঁটা পানি মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে আক্রান্ত স্থানে মাখিয়ে রেখে ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আক্রান্ত স্থানে পেস্ট মাখানোর পর এক টুকরা পরিষ্কার ব্যান্ডেজের কাপড় তার উপর বসিয়ে বেঁধে দিতে হবে।

নারিকেল তেল: আক্রান্ত স্থানে নারিকেল তেল সামান্য গরম করে মালিশ করলে উপকার পাওয়া যায়। গোড়ালিতে জমে থাকা বাড়তি ক্যালসিয়াম গলিয়ে ফেলতে সাহায্য করে এই তেল। পাশাপাশি ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে।

ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড: স্বাস্থ্যকর ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের শক্তিশালী প্রদাহরোধকারী উপাদান গোড়ালির ব্যথা থেকে মুক্তি দিতে পারে। এজন্য ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট কিংবা তেলযুক্ত সামুদ্রিক মাছ খাওয়া যেতে পারে।
তিসির তেল: গোড়ালির হাড় বেড়ে যাওয়ার চিকিৎসায় ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত এই তেল ব্যবহা করা যেতে পারে। এক টুকরা ব্যান্ডেজের কাপড় বা সাধারণ কাপড় তিসির তেলে ডুবিয়ে আক্রান্ত স্থানে তোয়ালে বা প্লাস্টিকের কাগজ দিয়ে বেঁধে রাখলে উপকার পাওয়া যায়।[২]