Home / লাইফ স্টাইল / হিমোগ্লোবিন কী? হিমোগ্লোবিন কমে গেলে যা যা হয় এবং যা খেলে হিমোগ্লোবিন বাড়বে!

হিমোগ্লোবিন কী? হিমোগ্লোবিন কমে গেলে যা যা হয় এবং যা খেলে হিমোগ্লোবিন বাড়বে!

হিমোগ্লোবিন হলো এক ধরনের প্রোটিন। এটি মানুষের শরীরে লোহিত রক্তকণিকার মধ্যে থাকে। এটা আমাদের শরীরে অক্সিজেন পরিবহনে সাহায্য করে। মানুষের শরীরের ভেতর প্রতিটি জায়গায় অক্সিজেন পৌঁছে দেয়ার কাজ হলো হিমোগ্লোবিনের। রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে অক্সিজেন সরবরাহও কমে যায়। আসুন জেনে নেই রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে যা যা হয়।

রক্তশূন্যতা: আমাদের শরীরে রক্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লোহিত রক্তকণিকা, আর লোহিত রক্তকণিকার প্রাণ হচ্ছে হিমোগ্লোবিন। এই হিমোগ্লোবিনের কাজ হলো ফুসফুস থেকে দেহকোষে অক্সিজেন পরিবহন করা। আবার আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন অক্সিজেন। কোনো কারণে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বা পরিমাণ কমে গেলে সেই অবস্থাকে অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা বলা হয়।

হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা: বয়স ও লিঙ্গ অনুসারে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা ভিন্ন। সাধারণত জন্মের সময় নবজাতকের দেহে এক লিটার রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ থাকে ২০০ গ্রাম। পরবর্তীকালে তিন মাস বয়স থেকে তা কমতে থাকে এবং প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। পরে প্রাপ্ত বয়সের সময় হিমোগ্লোবিন আবার বাড়তে শুরু করে। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রতি লিটার রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা ১৩০ থেক ১৮০ গ্রাম। নারীদের ক্ষেত্রে ১১৫ থেকে ১৬৫ গ্রাম। এ ক্ষেত্রে পুরুষ কিংবা নারীর প্রতি লিটার রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমান ৭০ কিংবা ৮০ গ্রাম হলে তাকে রক্তশূন্যতা বলা চলে।

লক্ষণ: বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই অ্যানিমিয়ার নির্দিষ্ট লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তবে এ ক্ষেত্রে বেশকিছু লক্ষণ প্রায় একই সঙ্গে থাকলে রক্ত পরীক্ষা করা খুবই জরুরি।

যেমন-

১. শরীর ফ্যাকাসে থাকবে ও প্রচুর ঘাম হবে।

২. বুক ধড়পড় করবে।

৩. নাড়ির স্পন্দন দ্রুত হবে।

৪. মাথা ঘোরার সঙ্গে মাথা ব্যথাও থাকতে পারে।

৫. চোখে ঝাপসা কিংবা কম দেখবে।

৬. মুখের কোণে ও জিহ্বায় ঘা হতে পারে।

৭. দুর্বলতা ও ক্লান্তিভাব। হজমে সমস্যা এবং পুরো শরীর ফুলে যায়।

৮. পা ফুলে যাওয়া সঙ্গে শ্বাসকষ্টও থাকতে পারে।

৯. অনিদ্রা কিংবা ঘুম কম হতে পারে। হৃৎপিন্ড বড় হয়ে যায় এবং দ্রুত হার্টবিট হতে থাকে।

সুস্থ জীবনযাপনে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা সঠিক থাকা প্রয়োজন। কিছু খাবার খেয়ে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মান ঠিক রাখা যায়। ভারতের ফর্টিস হাসপাতালের চিকিৎসক মনোজ কে আহুজার মতে, রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঝিম ধরা, ক্ষুধামান্দ্য ও দ্রুত হৃৎস্পন্দনের মতো সমস্যা দেখা যায়।

যদি হিমোগ্লোবিনের মাত্রা অনেক কম হয়, তবে রক্তাল্পতা বা এর চেয়েও মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসক আহুজার মতে, ‘সবার লৌহের দরকার হয়। তবে নারীদের ঋতুচক্রের সময়, গর্ভাবস্থায়, শিশুদের বেড়ে ওঠার সময়, রোগ থেকে সেরে ওঠার মুহূর্তে লৌহের বেশি দরকার হয়। সম্প্রতি এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে প্রাকৃতিক উপায়ে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ানোর উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। দেখে নিন কী খেলে হিমোগ্লোবিন বাড়বে।

১.ফলিক অ্যাসিড ফলিক অ্যাসিড আমাদের রক্তে লোহিত রক্ত কনিকা তৈরী হওয়ার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। সুতরাং হিমোগ্লোবিনের পরিমান বাড়িয়ে তোলার জন্য আমাদের ফলিক অ্যাসিড পূর্ণ খাবার খাওয়া জরুরি। আসুন দেখেনি কি কি খাবারে ফলিক অ্যাসিড থাকে। প্রতিদিনের খাবারের সাথে সবুজ শাক সবজি খাওয়া উচিত।

এতে প্রচুর পরিমানে ফলিক অ্যাসিড থাকে। যা আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমানকে বাড়িয়ে তোলে। চিকেন লিভার, মটন লিভার, ব্রকলি, কলা, বাদাম, স্প্রাউট, এগুলি আমাদের দেহে ফলিক অ্যাসিড যোগান দেয়। ফলত শরীরে হিমোগ্লোবিনের অভাব হলে উপরিউক্ত খাবার গুলি আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমানকে বাড়িয়ে তোলে।

২.আয়রন আয়রণের অভাব আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তাই স্বাভাবিক ভাবেই আয়রন যুক্ত খাবার আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের অভাব পূরণ করে। খেজুর, বেদনা, আপেল তরমুজ, আমলকি ইত্যাদি ফলগুলিতে প্রচুর পরিমানে আয়রন থাকে। এই ফলগুলি নিয়মিত খেলে আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমানকে খুব সহজে বাড়িয়ে তোলা যায়। বিশেষ করে রোজ একটি করে আপেল বা বেদনা খেলে আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমানকে কম হতে দেয় না।

ড্রাই ফ্রুটস যেমন কিসমিস, আলমন্ড, শুকনো খেজুর আয়রনের ভান্ডার। সুতরাং হিমোগ্লোবিন কম থাকলে এগুলি খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। পালংশাকে অফুরন্ত আয়রন থাকে।এটি শুধু আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমান বাড়িয়ে তোলার সাথে সাথে আমাদের দেহে ক্যান্সার সংক্রামনকেও রোধ করে।এছাড়া কুমড়োর বীজেও প্রচুর পরিমানে আয়রন থাকে।১০০ গ্রাম কুমড়োর বীজ আমাদের শরীরে ৮৩% আয়রনের যোগান দিতে পারে। সুতরাং হিমোগ্লোবিনের পরিমান বাড়িয়ে তোলার জন্য এই দুটি খাবারই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. ভিটামিন C ভিটামিন C এর সাহায্য ছাড়া আমাদের শরীর পুরোমাত্রায় প্রয়োজনীয় আয়রন গ্রহণ করতে পারেনা। আর আয়রনের অভাবে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার অন্যতম মূল কারণ। তাই শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমানকে বাড়িয়ে তোলার জন্য ভিটামিন C যুক্ত খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। ব্রকলি, টমেটো, ক্যাপসিকাম, পালংশাক এগুলি প্রত্যেকটিতে ভিটামিন C থাকে। হিমোগ্লোবিন কমে গেলে এগুলি হিমোগ্লোবিন বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। পাকাপেপে, কমলালেবু, পাতিলেবু, স্ট্রবেরী, আঙ্গুর এগুলি প্রত্যেকটি ভিটামিন C তে পরিপূর্ণ। হিমোগ্লোবিনের অভাব হলে এগুলি খাওয়া উচিত।

৪.বিট হিমোগ্লোবিন বাড়াতে বিটের রস খাওয়ার পরামর্শ দেন ডাক্তাররা। এতে রয়েছে প্রচুর আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, ফাইবার ও পটাশিয়াম। এর পুষ্টিমান শরীরের লাল রক্তকণিকা বাড়ায়।

৫. একটি আপেল বা আঙ্গুর প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে নাকি কখনো ডাক্তারের কাছে যেতে হয় না। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন। প্রতিদিন একটি করে আপেল খান। কিংবা অর্ধেক আপেল ও অর্ধেক বীটের জুস বানিয়ে দিনে দুইবার খেতে হবে। ডালিমেও রয়েছ আয়রন। এতে আদা বা লেবুর রস দিতে পারেন বাড়তি ফ্লেভারের জন্য। ডালিমে রয়েছে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফাইবার এবং প্রোটিন। ৬. ডালিম আয়রন, ক্যালসিয়াম, শর্করা ও আঁশ (ফাইবার) সমৃদ্ধ ডালিম রক্তে হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি করে দেহে রক্ত চলাচল সচল রাখে। নিয়মিত ডালিম খেলে রক্তস্বল্পতা দূর হয়ে যায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিদিন মাঝারি আকৃতির একটি ডালিম খাওয়ার চেষ্টা করুন। অথবা এক গ্লাস ডালিমের জুস খান।

৭. আমলকী আয়রন, মিনারেল এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ আমলকী রক্তে হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এটি রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বজায় রেখে শরীরে ভিটামিন সি এর অভাব পূরণ করে থাকে। প্রতিদিন খালি পেটে কয়েকটি আমলকী খাওয়ার অভ্যাস করুন। এটি রক্তে হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।

৮. পালং শাক ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ, বি ৯, ই, সি, বিটা কারটিন এবং আয়রন রয়েছে পালং শাকে, যা রক্ত তৈরি করে থাকে। আধা কাপ পালং শাক সিদ্ধতে ৩.২ মিলিগ্রাম আয়রন আছে যা নারীদের দেহে ২০% আয়রনের ঘাটতি পূরণ করে। এক কথায় এ শাককে সুপার ফুট বলা হয়।

৯. মাছ ও ডিম মাছ সব চাইতে ভালো আয়রনের উৎস বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ। শিং মাছ, ইলিশ মাছ, ভেটকি মাছ, টেংরা মাছ ইত্যাদি সব মাছেই রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় সর্বনিম্ন ৬০ গ্রাম মাছ রাখুন রক্তস্বল্পতা রোগ থেকে দেহকে মুক্ত রাখে। আর ডিম প্রোটিনে ভরপুর এ খাদ্যটি দেহে পুষ্টি যোগায়। অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি প্রতিদিন একটি ডিম খেলে রক্তস্বল্পতা দ্রুত দূর হবে।

১০. দুধ প্রতিদিন এক গ্লাস দুধ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও প্রোটিন যোগায়। দুধে খুব বেশি পরিমাণে আয়রন না থাকলেও এতে প্রায় সব রকমের ভিটামিন বি আছে। এছাড়াও দুধে আছে পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম। এই খাদ্য উপাদান গুলো রক্তের হিমোগ্লোবিন বাড়িয়ে রক্ত শূন্যতা দূর করতে সহায়তা করে। তাই রক্ত শূন্যতা রোগীদের জন্য নিয়মিত অন্তত এক গ্লাস করে দুধ খাওয়া উপকারী।